আব্দুল মজিদ তাই ঠিক করেছে এ বছর থেকে সে আর চাষে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবে না। সার, কীটনাশক দেবে না। বীজ কিনবে না। নিজের চাষাবাদের বীজ নিজেই রাখবেন। সে ফিরে যাবে তার বাপ দাদার চাষ পদ্ধতিতে।



বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই কৃষক আব্দুল মজিদ ঠিক করেছিলেন, বৃষ্টি না হলে সে এবার জমিতে চাষ দেবে না। চাতক পাখির মত তাই সে এখনও অপেক্ষায় আছে বৃষ্টির। আষাঢ় চলে গেছে, শ্রাবণও যাই যাই করছে, কিন্তু যেমন বৃষ্টি হলে জমিতে চাষ দেয়া যায় তেমন বৃষ্টির দেখা নেই এখনও। অথচ প্রতিবছরই আষাঢ়ে কম বেশি বৃষ্টি হয়। কোন কোন বছর বৃষ্টিতে মাঠ ডুবে যায়। জমি আর চাষের জো থাকে না।

আব্দুল মজিদদের বয়স এখন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই করছে। পঁয়ত্রিশ চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত তার এলাকায় বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে খুব ঝড় বৃষ্টি হতে দেখেছে সে। আর আষাঢ়- শ্রাবণে হত মুষলধারে বৃষ্টি। দিনের পর দিন সূর্যের দেখা মিলত না। সেই বৃষ্টি আর নদী থেকে ধেয়ে আসা জোয়ারের পানি মিলে বন্যা হয়ে যেত। সবাই বলত নতুন পানি এসেছে। ধাঁই ধাঁই করে তখন প্রতিদিন পানি বাড়ত। মাঠে পানি ঢুকতে শুরু করলেই কৃষকরা পাট কেটে জাগ দিত। নৌকাগুলো পুকুরের পানি থেকে তুলে কাঠমিস্ত্রি ডেকে মেরামত করা হত। কারণ বর্ষার এই তিন চার মাস নৌকা ছাড়া বাড়ির বাইরে যাওয়ার উপায় থাকত না।

যে বছর বন্যা বেশি হত সে বছর ফসলের অনেক ক্ষতি হত। কখনও কখনও বন্যায় রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ডুবে যেত। কৃষকেরা এই সময়ে চার পাঁচ মাস ছদ্মবেশী বেকার হয়ে পড়ত। কেউ কেউ মাছ ধরার পলো, রাবানী, জাল বুনত। কারণ মাছ ধরা ছাড়া বিশেষ কোন কাজ থাকত না তাদের। ঘরে ঘরে অভাব ছিল। বিশেষ করে ভূমিহীন ও দিনমজুররা দিনের পর দিন না খেয়ে কিংবা একবেলা তেঁতুল দিয়ে বুনো কচু ঘন্ট, গমের জাও খেয়ে বেঁচে থাকত। কেউ কেউ অবশ্য মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চালাত। কেউ কেউ আবার সম্মান চলে যাওয়ার ভয়ে মাছ বিক্রির মত কাজ করত না।

আব্দুল মজিদের পরিবার অবশ্য বেশ সচ্ছলই ছিল। বাবা আব্দুল কুদ্দুস পৈতৃক সূত্রে যা জমিজমা পেয়েছিল, তা নেহাত কম ছিল না। ফসল আদি যা জন্মাত তা দিয়ে পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে আব্দুল কুদ্দুসের সংসার ভালোই চলত। আর শাক-তরকারি বাড়ির আঙিনাতে হত। ছোট্ট একটা পুকুরে মাছ ছিল। যখন প্রয়োজন হত জাল ফেলে মাছ ধরে নিত। বিশেষ করে আত্মীয় স্বজন এলে। কখনও কখনও বাড়িতে পোষা মুরগিও জবাই হত। তখনও গ্রামের সচ্ছল পরিবারগুলো প্রতিদিন মাছ মাংস খাওয়ার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়নি।

আব্দুল কুদ্দুসের বারো পাকি জমি পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ভাগ হয়ে আব্দুল মজিদ পেয়েছে তিন পাকির কিছুটা বেশি। এই এলাকার জমিজমার হিসেব শতাংশ আর পাকিতেই হয়। ২২ শতাংশে হয় এক পাকি। বিঘে, কাঠার হিসাব তাই আব্দুল মজিদ বোঝেনা। সে বোঝে পাকি এবং শতাংশ। আব্দুল মজিদ তার ভাগের জমিটুকুতেই চাষাবাদ করে দুই সন্তানের সংসার চালাচ্ছে এতবছর ধরে। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছে কয়েক বছর আগেই। ছেলে আব্দুল হামিদ স্কুল পাশ করে আর পড়াশোনা করেনি। আব্দুল হামিদের চাষাবাদের প্রতি কোন আগ্রহ নেই। সে উপজেলা শহরের একটা কাপড়ের দোকানে সেলসম্যানের চাকরি করে। সকালে যায়, ফেরে রাত দশটার পরে। বেতন যা পায়, তা দিয়ে আব্দুল মজিদের সংসারের শ্রীবৃদ্ধি কিছু হয়নি। তবে তার বউমা খুব ভালো। শ্বশুর-শ্বাশুড়ির খুব যত্ন ও সম্মান করে।

এই যে এত বছর ধরে মাত্র তিন পাকি জমি চাষাবাদ করে সংসারটাকে টেনে যাচ্ছে আব্দুল মজিদ সেটা সম্ভব হয়েছে ফসল উৎপাদন বেড়েছিল বলে। গত শতাব্দীর শেষ দশকের গোড়ার দিকে পাশের গ্রামের ইদ্রিস মাষ্টার স্যালো মেশিন দিয়ে চাষ শুরু করলে ধান উৎপাদন বেড়ে গেলো পাঁচ গুণ। কৃষকেরা আগ্রহী হয়ে উঠলো সেচ দিয়ে ধান চাষের প্রতি। ধীরে ধীরে পিঁয়াজ, রসুন, পাট, সবজি সবকিছু চাষেই সেচ দেওয়া শুরু হল। বেড়ে গেলো সার-কীটনাশকের ব্যবহার। উৎপাদনও বাড়ল বিপুল পরিমানে। কৃষকের মুখে হাসি ফুটলো। ভূমিহীন দিন মজুরদের মুজুরীর দাম বাড়ল। অভাবী মানুষদের অভাব ঘুচে গেল।

গত দুই দশকে উঠে গেলো গরু, লাঙল, জোয়াল দিয়ে চাষ এবং ফসল কাটা ও মলাই। এসবের পরিবর্তে এলো যন্ত্র। সব যন্ত্র চালাতেই লাগে তেল অথবা বিদ্যুৎ। কিন্তু বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলায় চাষ যন্ত্রগুলো চালানো প্রায় অসম্ভব। আর তেলের দাম, সারের দাম দিন দিন বাড়ছে। বীজও কিনতে হয় তিন চার গুণ দামে।

আব্দুল মজিদ গত তিন চার বছরের উৎপাদন খরচ ও বিক্রি মূল্য হিসেব করে দেখেছে, দশ ভাগের বেশি লাভ হয় না। কোন কোন ফসল তো লোকসানেও বিক্রি করতে হয়। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিওর খবরে দেশের দ্রব্যমূল্য যা দেখে আব্দুল মজিদ বিক্রি করতে গিয়ে তার অর্ধেকও পায় না। অবাক হয়, ভাবে কেমনে তার ফসল অন্যের হাতে গিয়ে এত দামে বিক্রি হয়! ভেবে কুল কিনারা পায় না সে।

আব্দুল মজিদ তাই ঠিক করেছে এ বছর থেকে সে আর চাষে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবে না। সার, কীটনাশক দেবে না। বীজ কিনবে না। নিজের চাষাবাদের বীজ নিজেই রাখবেন। সে ফিরে যাবে তার বাপ দাদার চাষ পদ্ধতিতে। দুটো গরু পুষেছিলেন কোরবানী ঈদের বাজারে বিক্রি করবেন বলে। বিক্রি না করে গরু দুটো রেখে দিয়েছেন চাষ করবেন তাই। ইতিমধ্যে মিস্ত্রি ডেকে লাঙল, জোয়াল, মই, পাটা তৈরী করে নিয়েছেন। সেচ, চাষ ও মলাইয়ের যন্ত্র বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন অপেক্ষা শুধু বৃষ্টির। বৃষ্টি এলেই তিনি গরু দুটোর কাঁধে জোয়াল দিয়ে লাঙলের হাতল ধরে ফালাফালা করবেন তার জমি। বুনবেন বীজ।




অপ্রচলিত শব্দ ও অর্থ:

*জাগ দেওয়া- পানিতে ডুবিয়ে কয়েকদিন রেখে দেওয়া

*জাও- মিষ্টি ছাড়া পায়েশ

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন