১

অনেক বছর পর গ্রামে এলো শাওন। যে গ্রামে, যে বাড়িতে জন্ম, যে বাড়ির উঠোনের কাদামাটি মেখে সে বড় হয়ে উঠেছে, সেই বাড়িতে কত বছর আসা হয় না! আজ বাড়িতে পা রাখতেই কেমন একটা ঘোর লাগা শীতল হাওয়া এসে উন্মাতাল করে দেয় শাওনকে। এই বাতাস তার খুব চেনা। চোখ বন্ধ হয়ে আসে শাওনের। বন্ধ চোখ খুলতে পারছিল না শাওন অথবা খুলতে চাইছিল তার অবচেতন মন। সে একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে যায়। মাটিতে লেপটে বসে পড়ে। কতক্ষণ এভাবে বসে ছিল জানে না সে। হঠাৎ একটা কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে শাওন।

- আরে চাচা, তুমি কখনে আসলে? এমনে মাটিতে বসে আছো ক্যান? দেখোদি কান্ড, তোমার প্যান্টে তো মাটি লাগে গেছে!


শাওন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সামনে দাঁড়ানো হাশিম চাচা। তার চোখে মুখে বিস্ময়। সে ছুটে এসে প্যান্টের মাটি ছাড়ানোর চেষ্টা করে। ঘাড়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে নেয়।

- একটা খবর দিয়ে আসবা না! আমি তাইলে তোমারে বাসস্ট্যান্ডে আনতে যাইতাম।
- আমারি আসতে কোন সমস্যা হয় নি।
- হ, এখন তো রাস্তাঘাট সব পাকা হইছে। ভ্যান, অটোরিস্কা সব সময়ই চলে। চলো চলো, বাড়ির মদ্যি চলো।

হাশিম চাচার পিছন পিছন শাওন বাড়ির ভিতরে যায়। ভিতর উঠানে পৌঁছাতেই হাশিম চাচার মা, সম্পর্কে শাওনের দাদী এগিয়ে এসে শাওনের হাত ধরে।

- এ কিডারে! শাওন না?
- হ্যাঁ দাদী। কেমন আছেন আপনি?
- আর কেমন থাকবোরে দাদা। বুড়ো হয় গেছি, চোখে ঠিকমত দেখি না। চলাফেরা করতে পারি না, সারা গায়ে হাত পায়ে ব্যাথা। তুমার কতা কও, তুমি কেমন আছো? তুমার বউ ছাওয়ালপল কেমন আছে?
- ভালো আছি দাদী। ওরাও ভালো আছে।

হামিশ চাচা ঘর থেকে একটা চেয়ার এনে বারান্দায় বসতে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। দাদী পাশে একটা টুল টেনে নিয়ে বসে।

- কত বছর পরে তোরে দেখতেছি। হ্যারে ভাই, আমাগের কতা তোর মনে পড়তো না?

শাওন উত্তর দেয় না। দাদীর মুখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে। দাদী কী বোঝে শাওন বুঝতে পারে না। হাজার স্মৃতির ঝুড়ি খুলে বসেন তিনি। মন দিয়ে শোনে শাওন, বুকের মধ্যে তোলপাড় হতে থাাকে। বুক ফুঁড়ে হাহাকার বেরিয়ে আসতে চায়। চোখে অশ্রু টলমল করে। শাওন দ্রুত পকেট থেকে টিস্যু বের করে দাদীর চোখের আড়ালে চোখ মোছে। এতদিন এই জন্ম মাটিতে শাওন আসেনি, এ নিয়ে তার নিজেরও একটা কষ্ট আছে, ক্ষোভ আছে। কিন্তু সেগুলো শাওন প্রকাশ্যে আনতে চায় না। হয়ত অনেকেই অনেক কিছু জানে কিন্তু শাওন নিজে মুখে কিছু বলতে চায় না।

হাশিম চাচা এর মধ্যে গাছ থেকে ডাব পেরে আনে। অনেক বছর পর শাওন ডাবে মুখ লাগিয়ে পানি খায়। খেতে গিয়ে শাওনের টি-শার্ট খানিকটা ভিজে যায়। হাশিম চাচা অবশ্য গ্লাসে ঢেলে দিতে চেয়েছিল কিন্তু শাওন না করেছে। চাচী পাশের বাড়িতে গিয়েছিল কোন একটা কাজে, তিনিও আসেন। এসেই কী খেতে দেবে তাই নিয়ে তোলপাড় শুরু করে। চাচা মটর সাইকেল নিয়ে বাজারে চলে যায়।

শাওন উঠে যায় বাড়িটা ঘুরে দেখতে। তাদের ঘরটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে আছে। পশ্চিম পাশের বাঁশ বাগানটা এখনও আছে। কিন্তু বেশীর ভাগেরই মাথা মরা। নিচে ময়লার স্তুপ। দেখলেই বুঝা যায় এদিকে অনেকদিন পরিস্কার করা হয় না। বাঁশ বাগানের পাশেই একটা তেতুল গাছে অনেক তেঁতুল ধরে আছে। থোকা থোকা তেঁতুলগুলো দেখেই শাওনের জিহ্বা ভিজে ওঠে। এ এক চিরন্তন অদ্ভতুরে অনুভূতি। হঠাৎ শাওনের মনে পড়ে যায়, কয়েক বছর আগে দেশের খুব পরিচিত একজন মাওলানা তেঁতুলের সাথে নারীদের তুলনা দিয়ে একটা বেফাঁস মন্তব্য করে বিপদে পড়েছিল।

হাঁটতে হাঁটতে শাওন গিয়ে একটা নারকেল গাছের নিচে দাঁড়ায়। অনেক উঁচু হয়েছে গাছটা। গাছের গোড়া থেকে দশ পনের ফুট পোকায় খেয়ে গর্ত করে ফেলেছে। তবুও গাছে অনেকগুলো ডাব ও নারকেল ঝুলছে। জেলা হটিকালচার সেন্টার থেকে শাওন এই নারকেল গাছটার চারা এনে লাগিয়েছিল। শাওন তখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ে। প্রায় ত্রিশ বত্রিশ বছর আগের কথা।
কয়েকটা মেহগুনি গাছের চারাও লাগিয়েছিল। সেগুলো বড় হয়ে আসবাব বানানোর মত হয়ে গেছে। শাওন মেহগুনি গাছগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে গাছের উচ্চতা দেখতে গিয়ে হঠাৎ এলোমেলো একটা ভাবনায় ঢুকে যায়। আচ্ছা, মানুষ যদি এই গাছগুলোর মত সারাটা জীবন এমন লম্বা হতে থাকত। যদি ঢালপালা ছড়াত, শাখা প্রশাখা ছড়াত। মুহূর্তেই কিয়দংশের উত্তর নিজেই পেয়ে যায় শাওন। মানুষের তো ঢালপালা-শাখা প্রশাখা হয়। ছেলে মেয়ে, নাতি নাতনি এরাই তো ঢালপালা-শাখা প্রশাখা।

সামনের ছোট্ট পুকুরটা প্রায় ভরে গেছে। পুকুরের চালায় এখনও সারি সারি আম গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছগুলোর এখন অনেক বয়স। বেশীর ভাগ গাছেই শাওন ছোটবেলা থেকে আম ধরতে দেখেছে । কোন কোন গাছের দু’একটা ডাল বয়সের ভারে পাতা শুণ্য হয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। একটু ঝড়ো বাতাশ হলেই হয়ত ভেঙে পড়বে।

এ বাড়িতে ২৫টা উপরে আম গাছ আছে। সবই আঁটি আম। এই এলাকায় ফজলি, ল্যাংড়া, গোপাল ভোগের মত উন্নত জাতের আম নেই। সবার ধারণা এসব আগ গাছ এখানে হয় না। কেউ চারা এনে লাগিয়েছিল কি না জানা নেই শাওনের। এ বাড়ির আম গাছগুলোর অদ্ভুত সব নাম। বড় আম গাছ, বাঁকা আম গাছ, ত্যাড়া আম গাছ, আষাঢ়ে আম গাছ, মধু আম গাছ, মিঠা আম গাছ, মধ্য আম গাছ, চোরের আম গাছ ইত্যাদি। আম ও গাছের বৈশিষ্ট্যর সঙ্গে মিল রেখে গাছগুলোর নাম। যেমন বড় আম গাছের আম অনেক বড় বড়, এক একটা আম প্রায় এক কেজির মত ওজন হয়। ত্যাড়া আম গাছ হলো মাটি থেকে বাঁকা হয়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়া। চোরের আম গাছ নামকরণটা খুব অর্থবহ। গাছ লাগালোর পর যে বছর প্রথম আম ধরেছিল, সে আমগুলো চোরে চুরি করেছিল। সেই থেকে গাছটার নাম চোরের আম গাছ। মধু আম গাছের আম খুব মিষ্টি, অনেকটা মধুর মত। তাই এই গাছের নাম মধু আম গাছ। আমগুলো খুব ছোট ছোট, গোল কাগজি লেবুর চেয়ে কিছুটা বড়। এই গাছটা খুব উঁচু নয়, কিন্তু দেখতে খুব সুন্দর। দূর থেকে ছাতার মত। গাছটায় থোকায় থোকায় আম ধরে। এক থোকায় চল্লিশ থেকে একশোটা পর্যন্ত। গাছটায় এত পাতা যে, বাইরে থেকে দেখে বুঝা যায় না কী পরিমান আম আছে গাছে।

শাওনদের ছোটবেলায় মধু আম গাছের তলায় বাঁশের মাচা বসানো ছিল। গরমকালে দুপুরের রোদে শাওনরা এই মাচায় বসত গা জুড়াতে। মাঠ থেকে কাজ করতে করতে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়া কৃষকেরাও আসত একটু শান্তি পেতে। আবার কখনও কখনও পথচারীরাও বসত। দক্ষিণে পাঁচ ছয় বর্গকিলোমিটার বিস্তীর্ণ মাঠ। বাড়ি থেকে মাঠের শেষ সীমানা দেখা যায় না। মাঝখানে লক্ষী বিল। বিলে প্রায় সারা বছরই পানি থাকত। ফলে দক্ষিণে ঠান্ডা বাতাস হু হু করে এসে লাগত। শাওনরা একটা মাটির হাঁড়িতে টিউবয়েলের পানি রাখতো পথিক ও কৃষকদের খাওয়ার জন্য। সেই মাচা এখন নেই। শাওন তাই মধু আম গাছের মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে পড়া শিকরের উপর বসে পা ছড়িয়ে দেয়। সামনের মাঠে বড় ধান ক্ষেত। এই জমিটা শাওনদের। এক একরের মত জমি। আশির দশক পর্যন্ত এই মাঠে ছোনের ক্ষেত ছিল। তখন গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতেই ছোন দিয়ে ঘরের চালা তৈরী হত। খুব চাহিদা ছিল ছোনের। আশির দশকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির হতে থাকলে বাড়িতে বাড়িতে টিনের ঘর উঠতে শুরু করে। ছোনের চাহিদাও কমতে থাকে। শাওনের মা তখন ছোনের ক্ষেত ভেঙে ফেলে। ক্ষেতটার বেশির ভাগ ধানেই পাক ধরেছে। দুই চার দিনের মধ্যেই হয়ত ধান কেটে নেবে।
শীত এখনও পুরোপুরি চলে যায় নি। তবে যাই যাই করছে। ডিসেম্বর এই সময়টাতে ধান কেটে নেওয়ার পর পিঁয়াজ রসুন লাগনোর জন্য জমি প্রস্তুত করে কৃষকেরা। ইতিমধ্যে কৃষকেরা কেউ কেউ ধান কাটতে শুরু করেছে। কেউ কেউ জমিতে চাষ দিচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই এসব জমিতে পিঁয়াজ-রসুন লাগনো হবে। ছোট্টবেলার স্মৃতিগুলো শাওনকে তাড়িত করতে শুরু করে। তখনই হাশিম চাচা এসে কথা বলে ওঠে।

- আরে তুমি এইখানে বসে আছ! আর আমি সারা বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছি।
- এখানে এখন আর কেউ এসে বসে না, তাই না চাচা?
- আরে না না, এখানে কি বসার অবস্থা আছে? তাছাড়া মানুষ এখন প্রয়োজন ছাড়া কারো বাড়িতে যায় না। ওই যে একটা বাজার হইছে না! সবাই বাজারে গিয়ে বসে। চা খায়, গল্প করে, রাজনীতি করে, একজন আর একজনের পিছে কেমনে বাঁশ দেবে তার পরিকল্পনা করে। এতদিন পরে গ্রামে আসছ, ধীরে ধীরে সব জানবা, দেখবা।
- ও . . . .
শাওন উঠে দাঁড়ায়। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন কথা বলে ওঠে।
- কিডারে? শাওন নাকি?

শাওন ঘুরে তাকায়। দেখে পিছনে হারু শেখ দাঁড়িয়ে। শাওনদের পাশের বাড়িটাই হারু শেখদের। ওরা তিন ভাই দুই বোন। হারু শেখ সবার বড়। শাওন বছর দুয়েকের ছোট হবে হারু শেখের। খুব গরীব ছিল হারু শেখের পরিবার। বাড়ি ছাড়া চাষের জমি একেবারেই ছিল না। কিন্তু হারু শেখের বাবা নফর শেখ ঠান্ডা মাথার বুদ্ধিমান মানুষ ছিল। সে অন্যের জমি বর্গা চাস করত, আর নিজের ক্ষেতে কাজ না থাকলে অন্যের বাড়িতে জন দিত। হারু শেখের মা বাড়িতে হাঁস মুরগি ও একটা গাভি পালত। প্রতিদিন মাঠের কাজ শেষে নফর শেখ সেই হাঁস-মুরগির ডিম ও গাভির দুধ বাজারে নিয়ে বিক্রি করত। এভাবেই নফর শেখ তার পরিবারের উন্নতি করতে শুরু করেছিল। তারপর হারু একটু বড় হতেই সেও বাবার সাথে মাঠের কাজ, জন দেওয়া, ডিম দুধ বিক্রির কাজ শুরু করেছিল। শাওন যখন গ্রাম ছেড়ে যায় তখন হারু শেখের বাবা চাষের জমি কিনতে শুরু করেছে।

- এতকাল পর গ্রামের কথা মনে পড়ল। চাচা-চাচী কেমন আছেরে?
- এই আছে আর কি? মার শরীর তো অনেক বছর ধরেই খারাপ। চলাফেরা ঠিকমত করতে পারে না।
- হ, যহন সুস্থ ছিল তহন তো মাঝে মদ্যেই আসতো। এখন তো কেউ আসে না। তাই ঘরখানেও ভূত বাস করে আর জমিজমাও ভূতে চাষ করে।
- মানে!
- মানে আর কী! যাই হোক, আছিস তো দুই একদিন?
- দেখি
- সন্ধ্যেয় বাজারে আসিস। গল্প করবোনে।

হারু শেখ হাঁটতে শুরু করে। শাওন বুঝতে পারে এই হারু শেখ আর ছোটবেলায় দেখা হারু শেখের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।

- শয়তান! গ্রামটা জ্বালায়ে খাইলো!

হারু শেখ একটু দূরে যেতেই হামিশ চাচা স্বগোক্তির মত কথাটা বলে ওঠে। হাঁটতে হাঁটতেই শাওন হাশিম চাচার ঘুরে দিকে তাকায়। জানতে চায় হারু শেখ কিভাবে গ্রামটাকে জ্বালিয়ে খাচ্ছে। হাশিম চাচা উত্তর দেয় না। তার চোখে মুখে বিরক্তি।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন