বিচারক আরও বলেন- আবুল ফজল সাহেব তার চার সন্তানকে বঞ্চিত করে একজনকে সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লিখে দিয়ে নৈতিকভাবে অন্যায় করেছেন। অন্যায় করেছেন মোশাররফ সাহেবও। তিনি বাবার অন্ধ ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে, বাবাকে প্ররোচনা দিয়ে নিজের নামে বাবার সব সম্পত্তি লিখে নিয়েছেন, এটা বুঝা যায়।

দুই ভাই ও তিনবোনের মধ্যে নবনী ছোট। স্বামী আবসার আলী একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। নিজেও একটি বেসকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকায় নিজের রোজগারের টাকায় কেনা ফ্লাটে স্বামী ও পাঁচ বছরের মেয়েকে তার সুখের সংসার। নবনীর স্বামী আবসার সহজ সরল সংসারী মানুষ। তাদের আকাঙ্খাও বেশী নয়। অর্থ-সম্পদ যা আছে তাতেই খুশি তারা।
সেই নবনী, বাবা আবুল ফজল ও বড় ভাই মোশাররফের বিরুদ্ধে কোর্টে একটা কেস ঠুকে দেন। অভিযোগ বড় ভাইয়ের প্ররোচনায় বাবা তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বড় ভাইয়ের নামে লিখে দিয়ে অন্য ছেলেমেয়েদেরকে বঞ্চিত করেছেন।
কোর্টের নোটিশ পেয়ে আবুল ফজল খুব আহত হন। বড় ভাই মোশাররফ ক্ষেপে আগুন হয়ে উঠেন। ধর্মের ভয়, সমাজের ভয়, বাবার সম্মান, পরিবারের সম্মান, নানারকম যুক্তি দিয়ে বড় দুইবোন রুমানা ও মিথিলা, নবনীকে কেসটা তুলে নিতে বলে। নবনীকে বুঝাতে দুলাভাইয়েরা যোগ দেয় তাদের সাথে। কিন্তু নবনী জানে দুলাভাইয়েরাও এটা মানতে পারছে না। কিন্তু বোনেদের চাপে সেটা তারা বলতেও পারছে না। ছোট ভাই আশরাফ সাতে পাঁচে নেই। কিন্তু বাবা, বড় ভাই ও বোনেরা অনুমান করে নবনীকে প্ররোচনা দিয়ে কেসটা আশরাফই করিয়েছে।
নবনীর ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড় মোশাররফ। এরপর রুমানা, আশরাফ ও মিথিলা। মোশাররফ ইঞ্জিনিয়ার। সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ন অধিদপ্তরের প্রধান। রুমানা ও মিথিলা পুরোদস্তুর গৃহিনী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেও স্বামী-ছেলেমেয়ে-সংসারের বাইরে কিছুই ভাবতে পারেনি তারা। আশরাফ সব ভাইবোন থেকে আলাদা। ছোটবেলা থেকেই তার সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক। বইপড়া, লেখালেখি আর সংস্কৃতি চর্চা করেই তার দিন কাটে। সংসারও চলে এসব করেই।
আবুল ফজল কিন্তু আশরাফকে পছন্দ করে না। তার আশা ছিলো আশরাফ লেখাপড়া শেষ করে বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরি করবে। আশরাফ চাকরির পিছনে ছোটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সে একটা দৈনিক পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ছিলো। পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প ও কবিতা লিখতো। এখনও সেই পত্রিকাতেই নিয়মিত সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কলাম লেখেন। কিন্তু তার ভালো লাগে ছোটগল্প, কবিতা ও উপন্যাস লিখতে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বইও বেরিয়েছে। সাহিত্য জগতে তার বেশ নামও হয়েছে।
নবনীর বাবা আবুল ফজল বছর দশেক আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। অবসরের পরের বছরই স্ত্রীকে সাথে নিয়ে হজ্ব করে এসেছিলেন। দীর্ঘ রোগ ভোগের পর বছর দুয়েক আগে স্ত্রী গত হয়েছেন। আবুল ফজল এখন অনেকটাই একা। মফস্বল শহরের বাড়িটাতে আবুল ফজলের সাথে একটি ভাড়াটে পরিবার ছাড়া আর কেউ থাকে না। একজন প্রতিবেশী গরীব বিধবা মহিলা দুইবেলা এসে রান্না করা, কাপড় ধোয়া ও ঘরদোর পরিস্কার করে দেন।
নবনীরা পাঁচ ভাইবোনই কর্মসূত্রে ঢাকাতে বসবাস করে। আবুল ফজল ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন ছাড়া ছেলেমেয়েদের কাছে আসেন না। স্ত্রী মারা যাবার পর গত দুই বছরে তাঁর তিনটি স্ট্রোক হয়ে গেছে। প্রতিবারই বিছানায় পড়ে থাকতে হয়েছিলো কয়েক মাস করে। ছোট ভাই আশরাফই হাসপাতালে দেখাশোনা করা, বাসায় এনে সেবা করে আবার সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পরই আবুল ফজল আবার ফিরে গেছে মফস্বল শহরের বাড়িতে।
নবনীর বিশ্বাস করে বড় ভাই মোশাররফ বাবাকে তার বাসায় এনে রাখতে চাইলে তিনি ঢাকায় এসে থাকবেন। কিন্তু মোশাররফের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা নিজেদের কাছে আবুল ফজলকে রাখতে চায় না। স্ত্রী মারা যাবার পর, রোজার আগে আগে আবুল ফজলকে বাসায় নিয়ে এসেছিলো মোশাররফ। খুব খুশি মনে এসেছিলেন তিনি। মেয়েদেরকে বলেছিলেন মোশাররফের বাসায় থাকলে রোজা করা সহজ হবে। কিন্তু পাঁচ রোজার দিন হঠাৎ করেই আবুল ফজল ছোট ছেলে আশরাফের বাসায় চলে আসেন। তারপর ডাক্তার দেখিয়ে নিজের বাড়িতে চলে যান। কী হয়েছিলো, কেন বড় ছেলের বাসায় তিনি থাকলেন না, নবনী সেটা জানে না। শুনেছিলো, ঢাকায় থাকতে তার ভালো লাগছে না। আর ডাক্তার দেখানোর কাজটা যেহেতু আশরাফই করে তাই চলে যাওয়ার আগে আশরাফের বাসায় এসেছিলো। নবনী, রুমানা ও মিথিলা বাবাকে রোজার মাসটা তাদের যে কারো বাসায় থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি থাকেন নি।
হ্যাঁ, বাবা-মায়ের ডাক্তার দেখানো, হাসপাতালে ভর্তি, রাতদিন হাসপাতালে থেকে যত্ন নেওয়া সবসময় আশরাফই করে। মা মারা যাওয়ার আগে প্রায় ছয়-সাত বছর আশরাফই ডাক্তার- বাসা-হাসপাতাল-বাসা ছুটে বেরিয়েছে। মোশাররফ ও বোন দুলাভাইরা সময় পেলে অতিথির মত এসেছে, ভালোমন্দ খোঁজ খবর নিয়েছে, চলে গেছে। বাবা-মাকে হাসপাতালে ভর্তি করালে মোশাররফ অবশ্য প্রতিবারই হাসপাতালের একাউন্টে দশ হাজার টাকা জমা করে দিতেন। বাকিটা সব আশরাফের দায়িত্বে। এসব নিয়ে বোনদের, তাদের স্বামীদের ও সন্তানদের মধ্যে চাপা একটা অসন্তোস বহু বছর ধরেই আছে। কিন্তু মোশাররফকে কিছু বললে বাবা কস্ট পাবেন, এই ভেবে সবাই চুপ থাকেন।
কেসটা করা নবনীর জন্য সহজ ছিলো না। প্রথমত ভাইবোনেরা রাজি হয় নি। দ্বিতীয়ত থানা কেস নেয় নি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য হলো- যে কোন ব্যক্তি তার সম্পতি যে কাউকে দান করতে পারেন। এটা তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও ভালোলাগার ব্যাপার। এর জন্য পুলিসি কেস হতে পারে না। আর বাবার বিরুদ্ধে কেস- এ তো হতেই পারে না। অগত্যা নবনী উকিল খুঁজেছে। কিন্তু উকিলেরাও কেসটা নিতে চায় নি। শেষে একজন বৃদ্ধ উকিল কেসটা নিতে রাজি হয়। তারপর উকিল যখন কেসের আবেদন নিয়ে কোর্টে দাঁড়ায়, বিচারকও কেসটার মেরিট নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধে পড়ে যায়। কিন্তু উকিল ও নবনীর যুক্তি তর্কে শেষ পর্যন্ত বিচারক কেসটা গ্রহন করে শুনানির দিন ধার্য করে।
শুনানীর তারিখ পেয়ে আবুল ফজল খুব ভেঙে পড়ে। মোশাররফ সব ভাইবোনকে ডাকেন আলোচনার জন্য। নবনীর কাছে জানতে চান কতটা সম্পত্তি পেলে কেসটা তুলে নেবে সে? নবনী জানায়- সম্পত্তির জন্য আমি কেস করেনি। করেছি সন্তান হিসেবে আমার অধিকারের জন্য। এই কেসটার মাধ্যমে আমি বাবাদের জানাতে চাই যে- বাবা ইচ্ছা করলে যে কোন সন্তানকে তার সমস্ত সম্পত্তি দিতেই পারেন। কিন্তু তা হতে হবে যুক্তিযুক্ত। অন্য সন্তানদের সাথে অন্যায় করে নয়। সংসারে অথবা বাবা-মায়ের জন্য যদি কোন সন্তানের বিশেষ কোন অবদান থাকে, সেই শুধু এরকম সুবিধা পেতে পারে । আর সেরকম বিশেষ অবদান কারো না থাকলে বাবার সম্পত্তির ভাগ সন্তানেরা সবাই দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে পাবে।
নবনীর যুক্তিতে বঞ্চিত ভাইবোনেরাও কেউ একমত হতে পারে না। বড় ভাই মোশাররফ নবনীকে তার প্রাপ্য অংশ লিখে দিতে চায়। ছোট ভাই আশরাফ ও বোন-দুলাভাইয়েরা মোশাররফের দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী নিজের ভাগ লিখে নিয়ে কেসটা তুলে নিতে নবনীকে অনুরোধ করে। কিন্তু নবনী তাতে রাজি হয় না। ছোট ভাই ও বোন-দুলাভাইরা জানিয়ে দেয়- বাবার বিরুদ্ধে আমরা কোর্টে দাঁড়াতে পারবো না। তুই কেসটা হেরে যাবি।
নবনীও জানে কেসটায় হেরে যাবে সে। কিন্তু সে একটা উদাহরন তৈরী করতে চায়। সবাইকে জানাতে চায়, বাবারা যেন শুধুমাত্র তার প্রিয় একজন সন্তানকে অন্যায়ভাবে সম্পদ-সম্পত্তি দিয়ে ভাইবোনদের মধুর সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি না করেন। একই সাথে তিনিও পাপের ভাগি না হন।
কেসটা বেশ কয়েকদিন ধরে শুনানী হয়। নবনীর উকিল আবুল ফজলের কাছে জানতে চান- কেন তিনি বড় ছেলেকে তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লিখে দিয়েছেন? আবুল ফজল জানায়- ছোট ছেলে কোনদিন আমার কথা শোনে না। আমি চেয়েছিলাম ও লেখাপড়া করে ভালো চাকরি করবে। কিন্তু কি করলো ও? কোনদিন চাকরির চেষ্টাই করলো না। সাহিত্যিক হয়েছে। মাননীয় বিচারক, আপনি বলেন- সাহিত্য করে কেউ সংসার চালাতে পারে?
বিচারক, আবুল ফজলের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। নবনীর উকিল জেরা চালিয়ে যায়।
- আপনার মেয়ে তার অভিযোগে বলেছে- আপনার দেখাশোনা, চিকিৎসা এসব ছোট ছেলে আশরাফই করে। কথাটা কি সত্যি?
- হ্যাঁ তা করে। বড় ছেলে ছুটি পায় না, সময় পায় না তাই আশরাফ করে।
- তারমানে আপনার চিকিৎসা খরচ বড় ছেলে দেয়? আর সময় দেয় ছোট ছেলে?
আবুল ফজল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। উত্তর দিতে কিছুটা সময় নেয়।
- না। দুই ছেলেই খরচ করে।
- শুনেছি, গত দুই বছরে আপনাকে তিনবার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। কথাটা ঠিক?
আবুল ফজল মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
- আমার ইতোমধ্যে তিনবার স্ট্রোক হয়ে গেছে।
- এই যে তিনবার স্ট্রোক হলো? কে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলো? কে আপনাকে হাসপাতালে দিনরাত দেখাশোনা ও যত্ন নিতো?
- আশরাফ।
- আর হাসপাতালের খরচ কে দিয়েছে?
- মোশাররফ ও আশরাফ দুইজনই।
- ঠিক বলেছেন, দু’জনই। মাননীয় বিচারক, হাসপাতালের বিল পরিশোধের একটা হিসাব আপনার সামনের ফাইলে দেওয়া আছে। তিনবারের মোট হাসপাতাল বিল তিন লক্ষ চুরাশি হাজার দুইশো ষাট টাকা।এর মধ্যে মোশাররফ সাহেব দশ হাজার টাকা করে তিনবারে মোট ত্রিশ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করেছেন। বাকি টাকা পরিশোধ করেছেন আশরাফ সাহেব।
বিচারক ফাইল দেখে মাথা নেড়ে উকিলের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন।
- আরো আছে মাননীয় বিচারক। পাঁচ বছর আগে উনার একটা বড় অপারেশন হয়েছিলো। যেখানে প্রায় দুই লক্ষ টাকা খরচ হয়। তার পুরো বিলই আশরাফ সাহেব পরিশোধ করেন। এছাড়া উনার স্ত্রী, মানে অভিযোকরীর মা ছয়-সাত বছর অসুস্থ ছিলেন, তাকেও এই আশরাফ সাহেবই দেখাশোনা ও চিকিৎসা করিয়েছেন। মোশাররফ সাহেবের ইচ্ছা হলে কখনও দশ হাজার হাসপাতালের একাউন্টে জমা দিয়েছেন। ইচ্ছা না হলে দেন নি। মাননীয় বিচারক, আপনার সামনের ওই ফাইলে সব বিল দেওয়া আছে।
বিচারক ফাইলটা দেখা শেষ করে আবুল ফজলের দিকে তাকায়।
- আপনার এসব অভিযোগের বিষয়ে কিছু বলার আছে আবুল ফজল সাহেব?
আবুল ফজল মাথা নেড়ে না বলেন। আবুল ফজলের উকিল উঠে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলতে গেলে বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে নবনীর উকিলের আর কিছু বলার আছে কি না জানতে চান।
- আরও অনেক কিছুই বলার আছে মাননীয় বিচারক। কিন্তু আমি এখন আর একটা কথাই শুধু বলতে চাই।
- বলুন
- এই যে আবুল ফজল সাহেব, উনার অনেক সম্পত্তি। প্রচুর টাকা ব্যাংকেও জমা আছে। কিন্তু উনার চিকিৎসা, উনার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য উনি কোনদিন একটি টাকাও ব্যাংক থেকে তোলেন নি। আমার খুব অবাক লাগছে মাননীয় বিচারক, যে ছেলেকে উনি বলছেন অবাধ্য, চাকরি না করে সাহিত্য চর্চা করে বলে সংসার চালাতে পারে না, সেই অভাবী ছেলের অর্থেই উনার ও উনার স্ত্রীর চিকিৎসা চলে?
আবুল ফজলের উকিল ও নবনীর উকিলের দিনের পর দিন যুক্তি তর্ক উপস্থাপন চলে। নবনীর উকিলের একটা প্রশ্নে আবুল ফজল জানায়- মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ওরা সবাই চাকরি করে। সংসারে কারোরই অভাব নেই। তাই ভেবেছিলাম ওদের সম্পত্তি না হলেও চলবে।
যুক্তি তর্ক শেষে বিচারক রায়ের তারিখ ঘোষণা করেন। আবুল ফজল ও মোশাররফ বুঝতে পারে তারা কেসে হেরে যাচ্ছে। তাই আবার সবাইকে ডেকে কেসের রায়ের আগেই একটা সমাধানের পথ খোঁজে মোশাররফ। কিন্তু মোশাররফের চেষ্টায় আগুন ঢেলে দেন আবুল ফজল। আলোচনার আগের রাতে তিনি আত্মহত্যা করেন। ভাই-বোনেরা বাবার মৃত্যুর জন্য নবনীকে দোষারোপ করেন।
রায়ের দিন বিচারক আবুল ফজলের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে রায় ঘোষণা করে। রায়ে বিচারক বলেন- এই কেস আমাদের দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও ধমীয় দৃষ্টিকোন থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাদীকে ধন্যবাদ এরকম একটি ইস্যুকে সবার সামনে তুলে আনার জন্য। আশা করা যায়, এই কেসের মাধ্যমে আমাদের দেশের বাবা-মা ও ভাইবোনেরা সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে সচেতন হবেন।
বিচারক আরও বলেন- আবুল ফজল সাহেব তার চার সন্তানকে বঞ্চিত করে একজনকে স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি লিখে দিয়ে নৈতিকভাবে অন্যায় করেছেন। অন্যায় করেছেন মোশাররফ সাহেবও। তিনি বাবার অন্ধ ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে, বাবাকে প্ররোচনা দিয়ে নিজের নামে সব সম্পত্তি লিখে নিয়েছেন, এটা বুঝা যায়। আবুল ফজল সাহেব নিজেই বলেছেন মেয়েরা অভাবী নয় তাই তিনি মেয়েদের সম্পত্তি দেন নি। আর ছোট ছেলে আশরাফকে তিনি পছন্দ করতেন না, তার অবাধ্য হওয়া এবং পেশার কারণে। অন্যদিকে বড় ছেলেকে তিনি বেশী ভালোবাসতেন। কেন বাসতেন তার কোন যুতসই কারণ তিনি বলতে পারেন নি। আসামী পক্ষের উকিলের যুক্তিতেও উঠে আসে নি। এটাই হয়ত অন্ধ ভালোবাসা। অনেক সন্তানের প্রতিই বাবা-মায়ের এরকম ভালোবাসা দেখা যায়। এই ভালোবাসার সুযোগই নিয়েছে বড় ছেলে মোশাররফ। তার প্ররোচনাতেই আবুল ফজল সাহেব এটা করেছে বলে আদালত মনে করে। তা যদি না হত তাহলে মোশাররফ সাহেব তার বাবাকে এই অনৈতিক কাজ করতে বাধা দিতেন। অথবা বাবা সব সম্পত্তি লিখে দেবার পর, ভাইবোনদের সাথে বসে যার যা প্রাপ্য তা বুঝে দিতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। সেইজন্য এই আদালত মোশাররফ সাহেবকে ধিক্কার জানাচ্ছে।
কিন্তু বাংলাদেশের যে আইন, সেই আইন অনুসারে আবুল ফজল ও মোশাররফ সাহেবকে শাস্তি দেবার অধিকার কোন আদালতেরই নেই। সম্পত্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার অধিকারও আইনে নেই। কারন সম্পত্তির যিনি মালিক তিনি যে কাউকে তার সম্পত্তি দান করতে পারেন। গ্রহীতা খারাপ না ভালো মানুষ, সন্তান না অন্য কেউ, দাতার জীবেনে তার কোন অবদান আছে কি নেই, এসব প্রশ্ন এখানে অবান্তর। কিন্তু বাবা-মা, ভাইবোনদের এরকম অনৈতিক দান করা উচিত নয়।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন